বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো – সঠিক নাম ও খাওয়ার নিয়ম
বাচ্চারা যখন ঠিকমতো খেতে চায় না, ঘুমে দাঁত কাটে কিংবা সারাক্ষণ খিটখিট করে, তখন আমাদের মাথায় প্রথমেই কৃমির চিন্তা আসে। বিশেষ করে বাংলাদেশে আবহাওয়ার কারণে বাচ্চাদের কৃমি হওয়াটা খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখনই, যখন আমরা ফার্মেসিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই।
আসলে বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো কাজ করবে বা কোন বয়সে কোনটা দেওয়া নিরাপদ, এটা নিয়ে বাবা-মায়ের চিন্তার শেষ থাকে না। ভুল ঔষধ বা ভুল ডোজে হিতে বিপরীত হতে পারে। এই আর্টিকেলে আমি একদম সহজ ভাষায়, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেয়ার করব
কোন ঔষধগুলো সাধারণত ডাক্তাররা সাজেস্ট করেন, খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম কী এবং ঔষধের পাশাপাশি আর কী কী করলে আপনার সোনামণি সুস্থ থাকবে। চলুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
সূচিপত্রঃ বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো
- ভূমিকা
- বাচ্চাদের কৃমি হয়েছে বুঝবেন কীভাবে? (লক্ষণসমূহ)
- বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো? (সরাসরি উত্তর)
- বয়স অনুযায়ী কৃমির ঔষধের ভিন্নতা ও সতর্কতা
- কৃমির ঔষধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম ও সময়
- কৃমির ঔষধ কত দিন পর পর দেওয়া উচিত?
- ঔষধের পাশাপাশি হাইজিন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
- কৃমির ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ভয়ের কিছু আছে কি?
- ঘরোয়া উপায়ে কৃমি কমানোর চেষ্টা ও বাস্তবতা
- উপসংহার
- সাধারণ প্রশ্ন-উত্তর
ভূমিকাঃ বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো
বাচ্চা যখন হঠাৎ করে খাওয়া কমিয়ে দেয়, কিংবা মাঝরাতে মলদ্বারে চুলকানির কারণে কান্না করে ঘুম থেকে উঠে পড়ে, তখন বাবা-মা হিসেবে আমাদের অসহায় লাগে। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাচ্চারা নিজেদের কষ্টটা বুঝিয়ে বলতে পারে না, শুধু কান্না করে বা বিরক্ত করে।
আমাদের দেশে ধুলোবালি আর আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে কৃমির সমস্যা ঘরে ঘরে। অনেক সময় আমরা ভাবি বাচ্চা হয়তো এমনিতেই রোগা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আসল শত্রু যে পেটের ভেতর লুকিয়ে আছে, তা আমরা খেয়ালই করি না। তখনই আমাদের মাথায় প্রথম প্রশ্ন আসে, আসলে বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো এবং কোনটা খাওয়ালে বাচ্চা দ্রুত আরাম পাবে?
আরো পড়ুনঃ বাচ্চাদের জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায় জেনে নিন
এই ব্লগে আপনি শুধু ঔষধের নাম জানবেন না, বরং একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে কখন, কীভাবে এবং কেন ঔষধ খাওয়াবেন তার একটা পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন পাবেন। এখানে আমি কোনো ডাক্তারি প্রেসক্রিপশন দিচ্ছি না, বরং সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের যা জানা জরুরি, ঠিক সেটাই আলোচনা করব।
একটু ধৈর্য ধরে পুরোটা পড়লে আপনি জানতে পারবেন কৃমি দূর করার সঠিক উপায়গুলো। আমরা অনেক সময় ভুল ডোজে ঔষধ খাইয়ে ফেলি, যা বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ঔষধের নামের চেয়েও বেশি জরুরি হলো নিয়ম জানা। চলুন, ধাপে ধাপে বিষয়গুলো পরিষ্কার করা যাক।
আশা করছি, এই লেখাটি পড়ার পর আপনার মনে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না এবং আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
বাচ্চাদের কৃমি হয়েছে বুঝবেন কীভাবে? (লক্ষণসমূহ)
বাচ্চাদের পেটে কৃমি হলে তারা মুখে বলতে পারে না, কিন্তু তাদের আচরণে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে যা দেখে আমাদের বুঝে নিতে হয়। আমি দেখেছি, সবচেয়ে কমন লক্ষণ হলো বাচ্চার খাওয়ার রুচি একদম চলে যাওয়া। আগে যে বাচ্চাটি বাটি ভরে খিচুড়ি খেত, হঠাৎ করে সে এক চামচও মুখে নিতে চায় না।
এছাড়া, ঘুমানোর সময় দাঁত কটকট করা বা দাঁত ঘষা খুব পরিচিত একটি লক্ষণ। অনেক মুরুব্বি বলেন, দাঁত কটকট করা মানেই পেটে কৃমি কথাটা কিন্তু অনেকাংশেই সত্য। আরেকটি যন্ত্রণাদায়ক লক্ষণ হলো মলদ্বারে চুলকানি, বিশেষ করে রাতের বেলা।
গুড়া কৃমি বা পিনওয়ার্ম রাতে ডিম পাড়ার জন্য মলদ্বারের কাছে চলে আসে, যার ফলে বাচ্চা প্রচণ্ড অস্বস্তি বোধ করে এবং ঘুমাতে পারে না। অনেক সময় দেখবেন বাচ্চার পেটে ব্যথা হচ্ছে, কিন্তু টয়লেট ক্লিয়ার হচ্ছে না অথবা মাঝে মাঝে পাতলা পায়খানা হচ্ছে। শারীরিক লক্ষণের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনও দেখা যায়।
বাচ্চা অকারণে খিটখিট করে, কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারে না। যদি দেখেন বাচ্চার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে বা শরীরে রক্তের অভাব দেখা দিচ্ছে, তবে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ হুকওয়ার্ম বা রক্তচোষা কৃমি বাচ্চার শরীর থেকে পুষ্টি শুষে নেয়, ফলে ভালো খাবার খাইয়েও বাচ্চার স্বাস্থ্য ভালো হয় না।
বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো?
এখন আসি আসল কথায়, যেটি জানার
জন্য আপনারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন আসলে বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডাক্তাররা সাধারণত দুই ধরনের উপাদানের ঔষধ বেশি প্রেসক্রাইব
করে থাকেন। একটি হলো 'অ্যালবেনডাজল' (Albendazole) এবং অন্যটি 'মেবেনডাজল'
(Mebendazole)। ব্র্যান্ড নেম হিসেবে আমরা ফার্মেসিতে ‘Almex’, ‘Solas’,
‘Anthelm’, বা ‘Emin’ নামগুলো বেশি দেখি। এগুলো সিরাপ এবং চুষে খাওয়ার ট্যাবলেট উভয়
আকারেই পাওয়া যায়।
তবে কোনটা ভালো, তা নির্ভর
করে বাচ্চার বয়স এবং কৃমির ধরনের ওপর। সাধারণত ১ বছরের নিচে বাচ্চাদের জন্য কৃমির ঔষধ
দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তাররা খুব সতর্ক থাকেন এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ড ছাড়া সাজেস্ট
করেন না। ২ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের জন্য অ্যালবেনডাজল বা মেবেনডাজল বেশ কার্যকরী।
এই ঔষধগুলো কৃমিকে প্যারালাইজড করে ফেলে অথবা গ্লুকোজ শোষণ বন্ধ করে মেরে ফেলে, যা
পরে মলের সাথে বেরিয়ে যায়।
তবে মনে রাখবেন, "ভালো
ঔষধ" মানেই দামী ঔষধ নয়। জেনেরিক নাম ঠিক থাকলে এবং স্বনামধন্য কোম্পানির হলে
কাজ একই হবে। আমার পরামর্শ হলো, টিভি বা ইন্টারনেটের বিজ্ঞাপন দেখে হুট করে ঔষধ কিনবেন
না। আপনার বাচ্চার ওজন এবং বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজটি একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তারের কাছ
থেকে জেনে নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ ভুল ঔষধ কৃমি তো মারবেই না, উল্টো বাচ্চার
লিভারে চাপ ফেলতে পারে।
বয়স অনুযায়ী কৃমির ঔষধের ভিন্নতা ও সতর্কতা
কৃমির ঔষধ কিন্তু প্যারাসিটামলের
মতো নয় যে জ্বর এলেই খাইয়ে দিলাম। এখানে বয়সের ব্যাপারটা খুব সেনসিটিভ। অনেক মা-বাবা
না বুঝেই ৬ মাসের ছোট বাচ্চাকে কৃমির সিরাপ খাইয়ে দেন, যা মারাত্মক ভুল। সাধারণত ১
বছরের কম বয়সী শিশুদের কৃমির ঔষধ দেওয়া হয় না, যদি না ডাক্তার বিশেষ কোনো কারণে প্রেসক্রাইব
করেন। কারণ, এই বয়সে তাদের লিভার ঔষধের মেটাবলিজম বা ধকল সইতে পারে না।
১ থেকে ২ বছর বয়সী বাচ্চাদের
জন্য সাধারণত অর্ধেক ডোজ বা ২০০ মিলিগ্রামের অ্যালবেনডাজল দেওয়া হয়। আবার ২ বছরের উপরের
বাচ্চাদের জন্য পূর্ণ ডোজ বা ৪০০ মিলিগ্রাম দেওয়া হয়। ঔষধের ফর্মেও ভিন্নতা থাকে। ছোট
বাচ্চারা ট্যাবলেট চিবিয়ে খেতে পারে না বা গলায় আটকে যাওয়ার ভয় থাকে, তাই তাদের জন্য
সিরাপ বা সাসপেনশন বেস্ট। আবার একটু বড় বাচ্চা, যারা ৫-৬ বছরের, তারা চকোলেটের স্বাদের
চিউয়েবল ট্যাবলেট খুব মজা করে খেয়ে নেয়।
সতর্কতা হিসেবে বলি, বাচ্চার
যদি অন্য কোনো অসুখ থাকে, যেমন জন্ডিস, লিভারের সমস্যা বা খুব বেশি জ্বর, তখন কৃমির
ঔষধ খাওয়ানো ঠিক নয়। সুস্থ অবস্থায় ঔষধ খাওয়ানো উচিত। আর হ্যাঁ, ঔষধের বোতলে লেখা নির্দেশনা
বা ফার্মেসির দোকানদারের কথার চেয়ে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এখানে বেশি জরুরি।
কারণ প্রতিটি বাচ্চার শারীরিক গঠন ও সহনক্ষমতা আলাদা।
কৃমির ঔষধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম ও সময়
আমরা অনেকেই ঔষধ কিনি ঠিকই,
কিন্তু খাওয়ানোর নিয়মটা ভুল করি। কৃমির ঔষধ খাওয়ানোর সেরা সময় কোনটা? ডাক্তারি মতে
এবং অভিজ্ঞদের কথায়, রাতের বেলা খাবারের পর বা ঘুমানোর আগে ঔষধ খাওয়ানোটা সবচেয়ে ভালো।
এর কারণ হলো, রাতে কৃমিরা পেটের ভেতর বেশি সক্রিয় থাকে এবং ঔষধটি দীর্ঘ সময় ধরে পেটে
কাজ করার সুযোগ পায়। এছাড়া রাতে খাওয়ালে ঔষধের সামান্য মাথা ঘোরার মতো সাইড ইফেক্ট
থাকলেও বাচ্চা ঘুমের মধ্যে তা টের পায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ টিপস
হলো, কৃমির ঔষধ চিবিয়ে খাওয়ালে বা সিরাপ আকারে দিলে সাথে একটু চর্বিযুক্ত খাবার (যেমনঃ দুধ
বা একটু তেলযুক্ত খাবার) খাওয়ালে ঔষধের শোষণ বা Absorption ভালো হয়। চিউয়েবল ট্যাবলেট
হলে বাচ্চাকে বলবেন যেন ভালো করে চিবিয়ে খায়, সরাসরি গিলে ফেললে কাজ কম হতে পারে। সিরাপের
ক্ষেত্রে বোতলটি ভালো করে ঝাকিয়ে নিতে ভুলবেন না।
অনেকে মনে করেন চিনি বা মিষ্টি
খাওয়ালে কৃমি বাড়ে, তাই ঔষধ খাওয়ার সময় মিষ্টি বন্ধ রাখেন। এটা পুরোপুরি সঠিক নয়, তবে
ঔষধ চলাকালীন সময়ে বাইরের খোলা খাবার, আধা-সেদ্ধ মাংস বা অপরিষ্কার শাকসবজি খাওয়া একদম
নিষেধ। ঔষধ খাওয়ানোর পর বাচ্চাকে প্রচুর পানি খাওয়াতে হবে যাতে শরীর থেকে টক্সিনগুলো
সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে। এই ছোট ছোট নিয়মগুলো মানলেই ঔষধের পূর্ণ কার্যকারিতা পাওয়া
সম্ভব।
কৃমির ঔষধ কত দিন পর পর দেওয়া উচিত?
কৃমির ঔষধ একবার খাওয়ালেই
কি সব শেষ? একদম না। কৃমির জীবনচক্র আছে। ঔষধ খাওয়ালে পেটের বড় কৃমিগুলো মারা যায় ঠিকই,
কিন্তু কৃমির ডিমগুলো অনেক সময় বেঁচে থাকে। এই ডিম ফুটে আবার লার্ভা এবং পূর্ণাঙ্গ
কৃমি হতে কিছুটা সময় লাগে। তাই ডাক্তাররা সাধারণত প্রথম ডোজ দেওয়ার ৭ থেকে ১০ দিন পর
অথবা ১৪ দিন পর একটি 'বুস্টার ডোজ' বা দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দেন। এটি মিস করলে
চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আরো পড়ুনঃ বাচ্চাদের পেট ফাঁপা দূর করার ঘরোয়া উপায় জেনে নিন
আর রুটিন করে খাওয়ানোর ব্যাপারে
বলতে গেলে, বাংলাদেশে যেহেতু কৃমির প্রকোপ বেশি, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমাদের
ডাক্তাররা প্রতি ৬ মাস পর পর পরিবারের সবাইকে কৃমির ঔষধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। এখানে
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো "পরিবারের সবাই"। আপনি যদি শুধু বাচ্চাকে ঔষধ
খাওয়ান আর আপনি বা বাসার কাজের মানুষ না খান, তবে কয়েকদিনের মধ্যেই বাচ্চা আবার আপনার
কাছ থেকে কৃমিতে আক্রান্ত হবে।
কারণ কৃমি অত্যন্ত ছোঁয়াচে।
একই বাথরুম ব্যবহার, বিছানার চাদর, তোয়ালে বা খাবারের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। তাই ক্যালেন্ডারে
দাগ দিয়ে রাখুন এবং বছরে অন্তত দুইবার যেমন গরমের শুরুতে আর শীতের শুরুতে পুরো পরিবার
একসাথে কৃমির ঔষধ খেয়ে নিন। একে বলা হয় "Mass De-worming"। এতে ঘর থেকে কৃমি
নির্মূল করা সহজ হয় এবং বাচ্চার বারবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে।
ঔষধের পাশাপাশি হাইজিন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
সবচেয়ে দামী ঔষধ খাইয়েও কোনো
লাভ হবে না, যদি আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা হাইজিন মেইনটেইন না করি। কৃমি তো আর
আকাশ থেকে পড়ে না, এটা আমাদের মুখ দিয়েই শরীরে ঢোকে। আমি আমার বাচ্চার ক্ষেত্রে যেটা
করি, তা হলো খেলাধুলা শেষ করার পর এবং খাওয়ার আগে অবশ্যই ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে
দেই। বাচ্চাদের নখ বড় রাখা মানেই সেখানে কৃমির ডিমের বাসা, তাই প্রতি সপ্তাহে নিয়ম
করে নখ কাটা বাধ্যতামূলক।
টয়লেট থেকে আসার পর হাত ধোয়ার
অভ্যাসটা ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে। গ্রামের দিকে বা শহরেও অনেক বাচ্চা খালি পায়ে
হাঁটে। হুকওয়ার্ম কিন্তু পায়ের পাতা ছিদ্র করে শরীরে ঢোকে। তাই বাচ্চাকে সবসময় স্যান্ডেল
বা জুতা পরিয়ে রাখার চেষ্টা করুন। এছাড়া ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার আগে খুব ভালো করে ধুয়ে
নিতে হবে, প্রয়োজনে কিছুক্ষণ লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখা ভালো।
আরেকটা বিষয় আমরা অবহেলা করি,
সেটা হলো আন্ডারগার্মেন্টস বা অন্তর্বাস। কৃমি আক্রান্ত বাচ্চার প্যান্ট বা বিছানার
চাদর গরম পানি দিয়ে ধোয়া উচিত এবং কড়া রোদে শুকানো উচিত। রোদ কৃমির ডিম নষ্ট করতে সাহায্য
করে। বাচ্চার খেলনাগুলোও মাঝে মাঝে পরিষ্কার করা দরকার। মনে রাখবেন, ঔষধ কৃমি মারে,
কিন্তু হাইজিন কৃমি হওয়া প্রতিরোধ করে। প্রতিরোধই হলো আসল চিকিৎসা।
কৃমির ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: ভয়ের কিছু আছে কি?
যেকোনো ঔষধেরই কিছু না কিছু
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, কৃমির ঔষধও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে ভয়ের কিছু নেই, কারণ
এই ঔষধগুলো সাধারণত খুব নিরাপদ বা 'Well tolerated' হয়। ঔষধ খাওয়ানোর পর বাচ্চার হালকা
বমি বমি ভাব, পেটে সামান্য ব্যথা বা মোচড় দেওয়া, কিংবা মাথা ঘোরার মতো সমস্যা হতে পারে।
অনেক সময় বাচ্চা একটু ঝিমুনি ভাব অনুভব করতে পারে।
মাঝে মাঝে দেখবেন ঔষধ খাওয়ার
পর বাচ্চার পাতলা পায়খানা হচ্ছে। এটা অনেক সময় মৃত কৃমি শরীর থেকে বের হওয়ার কারণেও
হতে পারে। এসব লক্ষণ সাধারণত ক্ষণস্থায়ী এবং ১-২ দিনের মধ্যে এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়।
তবে যদি দেখেন বাচ্চার শরীরে র্যাশ উঠছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বা বমি কিছুতেই থামছে না,
তবে বুঝতে হবে তার ওই ঔষধে অ্যালার্জি আছে। সেক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তার দেখাতে হবে।
অনেক অভিভাবক ভয় পান যে কৃমির
ঔষধ খাওয়ালে বাচ্চা দুর্বল হয়ে যাবে। এটা ভুল ধারণা। বরং কৃমি থাকলে বাচ্চা দুর্বল
থাকে, ঔষধ খাওয়ার পর কৃমি চলে গেলে বাচ্চার খাবারের পুষ্টি শরীরে লাগে এবং সে সবল হয়ে
ওঠে। তাই ছোটখাটো সাইড ইফেক্টের ভয়ে ঔষধ না খাওয়ানো বোকামি। শুধু ভরা পেটে খাওয়ালে
এবং সঠিক ডোজ মানলে এই সমস্যাগুলো হওয়ার সম্ভাবনা খুব কমে যায়।
ঘরোয়া উপায়ে কৃমি কমানোর চেষ্টা ও বাস্তবতা
আমাদের নানি-দাদিদের মুখে
অনেক ঘরোয়া টোটকার কথা শুনি। যেমন সকালে খালি পেটে কাঁচা হলুদ, রসুনের রস, আনারস বা
করলা খাওয়া। এগুলো কি আদৌ কাজ করে? সত্য বলতে, কিছু কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের কৃমিিনাশক
গুণাবলী আছে। যেমন আনারসে থাকা 'ব্রোমেলিন' এনজাইম বা রসুনের অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক
গুণ কিছুটা সাহায্য করতে পারে। মিষ্টি কুমড়োর বিচিও কৃমি দূর করতে বেশ জনপ্রিয়।
আরো পড়ুনঃ স্ক্যাবিস দূর করার ঘরোয়া উপায় জেনে নিন
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাচ্চার
পেটে যখন কৃমির বাসা বেঁধে ফেলে, তখন শুধু ঘরোয়া টোটকা দিয়ে সেটা পুরোপুরি নির্মূল
করা কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। এছাড়া ছোট বাচ্চারা কাঁচা রসুন বা করলার রস খেতে চায় না,
জোর করে খাওয়ালে বমি করে দিতে পারে। আর অতিরিক্ত আনারস বা কাঁচা হলুদ বাচ্চার পেটে
অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই আমার পরামর্শ হলো, ঘরোয়া
উপায়গুলোকে সাপোর্টিভ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাখতে পারেন, কিন্তু চিকিৎসার
বিকল্প হিসেবে নয়। ডাক্তার নির্দেশিত আধুনিক এলোপ্যাথিক ঔষধগুলো অনেক বেশি পরীক্ষিত
এবং দ্রুত কার্যকরী। ঘরোয়া উপায়ের ওপর ভরসা করে সময় নষ্ট করলে বাচ্চার শরীরের ক্ষতি
বাড়তে পারে। তাই বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার ওপর আস্থা রাখাই শ্রেয়।
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১. বাচ্চার জ্বর থাকলে কি কৃমির ঔষধ খাওয়ানো যাবে?
না, বাচ্চার জ্বর বা অন্য
কোনো অসুস্থতা থাকলে কৃমির ঔষধ না খাওয়ানোই ভালো। সুস্থ অবস্থায় ঔষধ দিলে শরীর সেটা
সহজে গ্রহণ করতে পারে। অসুস্থ অবস্থায় দিলে বাচ্চার অস্বস্তি বাড়তে পারে।
২. ১ বছরের কম বয়সী বাচ্চাকে কি কৃমির ঔষধ দেওয়া যায়?
সাধারণত ১ বছরের নিচে কৃমির
ঔষধ দেওয়া হয় না। তবে বাচ্চার অবস্থা খুব খারাপ হলে বা ডাক্তার যদি মনে করেন জরুরি,
কেবল তখনই ডাক্তারের কড়া নজরদারিতে দেওয়া যেতে পারে। নিজে থেকে কখনোই দেবেন না।
৩. কৃমির ঔষধ কি খালি পেটে খাওয়া ভালো?
না, কৃমির ঔষধ ভরা পেটে বা
খাওয়ার পর খাওয়া ভালো। খালি পেটে খেলে পেটে ইরিটেশন বা বমি ভাব হতে পারে। রাতে ঘুমানোর
আগে খাওয়ালে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়।
৪. চিনি বা মিষ্টি খেলে কি সত্যিই কৃমি হয়?
এটা একটা প্রচলিত ভুল ধারণা।
চিনি বা মিষ্টি সরাসরি কৃমি তৈরি করে না। তবে মিষ্টি জাতীয় খাবার দাঁতে লেগে থাকলে
বা অপরিচ্ছন্নভাবে খেলে সেখানে জীবাণু বাড়ে, যা পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
কৃমি মূলত আসে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে।
৫. বাসার সবাই কি একসাথে ঔষধ খেতে হবে?
হ্যাঁ, অবশ্যই। কৃমি খুবই
ছোঁয়াচে। বাচ্চার হলে মায়েরও হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই একজন সুস্থ হলেও, পুরো পরিবার
একসাথে ডোজ কমপ্লিট করলে ঘর থেকে কৃমি নির্মূল করা সম্ভব হয়।
উপসংহারঃ বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ কোনটা ভালো
পরিশেষে একজন বাবা বা মা হিসেবে
আমি এটাই বলব, বাচ্চার স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে সেই
দুশ্চিন্তা দূর করার উপায় হলো সঠিক তথ্য জানা। আজ আমরা জানলাম বাচ্চাদের কৃমির ঔষধ
কোনটা ভালো, কখন খাওয়াতে হয় এবং কীভাবে সাবধান থাকতে হয়। মনে রাখবেন, শুধু ঔষধ খাইয়ে
দায়িত্ব শেষ করবেন না। বাচ্চাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার শিক্ষা দেওয়াটা ঔষধের চেয়েও
বেশি জরুরি।
বছরে দুইবার নিয়ম করে পুরো
পরিবার ডি-ওয়ার্মিং বা কৃমিনাশক ডোজ কমপ্লিট করুন। এতে আপনার সোনামণি যেমন সুস্থ থাকবে,
তেমনি তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে না। আর যেকোনো ঔষধ খাওয়ানোর আগে
একবার অন্তত ডাক্তারের সাথে কথা বলে ডোজটা কনফার্ম করে নেবেন।
আপনি একা নন, আমরা সব অভিভাবকই
এই সমস্যাগুলোর মধ্য দিয়ে যাই। একটু সচেতন হলেই এগুলো মোকাবিলা করা খুব সহজ। আপনার
বাচ্চার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি, ভালো থাকবেন।
